যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্রে শিশুখাদ্যের জন্য হাহাকার, নেপথ্যের কারণ

নন্দন নিউজ ডেস্ক: শিশু খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত বেবি ফর্মুলার সংকট দেখা দিয়েছে পুরো যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে। দেশটির প্রায় সব অঙ্গরাজ্যেই দেখা দিয়েছে এ শিশুখাদ্য সংকট। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকা এবং গ্রামীণ এলাকাগুলোতে এ সংকট চরমে পৌঁছেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বেশিরভাগ মা-বাবাই তাদের শিশুদের খাবার হিসেবে বিভিন্ন কোম্পানির প্যাকেটজাত বেবি ফর্মুলার ওপর নির্ভরশীল। এ বেবি ফর্মুলার ওপর নির্ভরশীল শিশুদের মুখে প্রয়োজনীয় খাবার তুলে দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বাবা-মায়েদের। ফার্মেসি, সুপারস্টোর ও ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলোতে শূন্য পড়ে থাকছে বেবি ফর্মুলার তাকগুলো। ফর্মুলার খোঁজে উদ্বিগ্ন বাবা-মায়েরা এক স্টোর থেকে আরেক স্টোরে ছুটে বেড়াচ্ছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক প্যাকেট বেবি ফর্মুলার জন্য মাইলের পর মাইল পাড়ি দিতে হচ্ছে তাদের। এ অবস্থায় অনেক স্টোরেই বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে বেবি ফর্মুলা। এতে বিপাকে পড়েছেন নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো। পাশাপাশি যেসব পরিবার দীর্ঘ দূরত্ব ভ্রমণ করতে অসমর্থ তারাও হিমশিম খাচ্ছে তাদের প্রিয় শিশুটির জন্য বেবি ফর্মুলা সংগ্রহ করতে।
যুক্তরাষ্ট্রে কেন এ শিশু খাদ্যের সংকট?

শিশুদের জন্য ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতির কারণে সম্প্রতি বেবি ফর্মুলা উৎপাদনকারী কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম শিশু খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাবট নিউট্রিশন। অ্যাবটের আকস্মিক এ উৎপাদন বন্ধের ঘোষণায় মূলত যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে সংকট সৃষ্টি হয় বেবি ফর্মুলার। বন্ধ কারখানা এখনও চালু না হওয়ায় সহসাই এ পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার তেমন কোনো সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনস্ট্রেশন (এফডিএ) জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহে অ্যাবটের বন্ধ হওয়া কারখানায় ফের উৎপাদন শুরু হতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের কাছে বেবি ফর্মুলা সহজলভ্য হতে সময় নেবে আরও বেশ কয়েক সপ্তাহ। এর মানে সামনের আরও বেশ কিছুদিন ফাঁকা থাকবে ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ও সুপার শপগুলোর বেবি ফর্মুলার তাক।

শিশু খাদ্যের সংকটে আতঙ্কিত অভিভাবকরা

বেবি ফর্মুলার এ সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে উদ্বিগ্ন অভিভাবকদের ‘প্যানিক বায়িং’ এর কারণে। অনেক বাবা-মায়েরাই শিশুদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত বেবি ফর্মুলা কিনে রাখছেন।

এ পরিস্থিতিতে টার্গেট, ওয়ালমার্ট, সিভিএস এবং ওয়ালগ্রিনের মতো যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সব বড় বড় ফার্মেসি ও সুপারশপ চেইনগুলো ইতোমধ্যেই রেশনিংয়ের মাধ্যমে তাদের কাছে মজুত বেবি ফর্মুলা বিক্রি করছে।

এদিকে বেবি ফর্মুলার ওপর নির্ভরশীল শিশুদের মুখে খাবার তুলে দিতে মরিয়া হয়ে উদ্বিগ্ন বাবা-মা ফর্মুলার সাথে অতিরিক্ত পানি মিশিয়ে কিংবা নিজেদের মতো করে ফর্মুলা তৈরি করে শিশুদের খাওয়াচ্ছেন।
প্রশ্নবিদ্ধ বাইডেন প্রশাসনের ভূমিকা

এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে উঠেছে আলোচনা ও সমালোচনার ঢেউ। বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠছে এ সংকটের কারণ হিসেবে সরকারের ব্যর্থতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের শিশু খাদ্য নিরাপত্তার পুরো প্রক্রিয়া নিয়েই।

অর্থনৈতিকভাবে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্র তাদের ছোট ছোট শিশুদের মুখে প্রয়োজনীয় খাবার তুলে দিতে ব্যর্থ হচ্ছে কেন? কিংবা এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসন কী করছে? এ সব নিয়ে জোর আলোচনা হচ্ছে দেশটির বিভিন্ন মহলে। পাশাপাশি পরিস্থিতি সামলাতে ব্যর্থতার জন্য এফডিএকে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের।

শিশুখাদ্যের বাজারে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া কর্তৃত্ব

যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে শিশুখাদ্যের এ সংকটের সঙ্গে করোনাভাইরাসজনিত সাপ্লাই চেইনের সংকটেরও কিছুটা সম্পর্ক রয়েছে। সাপ্লাই চেন সংকটের কারণে যুক্তরাষ্ট্রজুড়েই বিঘ্নিত হচ্ছে বিভিন্ন পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা। এর মাশুল সবচেয়ে বেশি দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যাঞ্চলীয় এলাকাগুলোসহ প্রত্যন্ত এবং গ্রামীণ এলাকাগুলো। পাশাপাশি শিশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত বেবি ফর্মুলার ব্যবসায় কয়েকটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া কর্তৃত্বও এ সংকটের পেছনে অনেকাংশ দায়ী।

যুক্তরাষ্ট্রের বেশিরভাগ বাবা-মায়েরাই তাদের শিশুদের খাবার হিসেবে বেবি ফর্মুলাকেই বেছে নেয়। আর দেশটির ৯০ শতাংশ বেবি ফর্মুলার বাজার নিয়ন্ত্রণ করে মূলত চারটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান অ্যাবট নিউট্রিশন, রেকিট বেনকাইজার, নেসলে ইুউএসএ এবং পেরিগো। এর মধ্যে অ্যাবট নিউট্রিশন যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম বেবি ফর্মুলা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান।

শিশুর খাবারের জন্য মাইলের পর মাইল ঘুরছেন অভিভাবকরা

মূলত সংকটের শুরু গত ফেব্রুয়ারিতে। এ সময় অ্যাবটের মিশিগানের কারখানায় তৈরি বেবি ফর্মুলা খেয়ে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের কারণে হাসপাতালে ভর্তি হয় কয়েকটি শিশু। তার মধ্যে দুজন মারা যায়। এ পরিস্থিতিতে বাজার থেকে ওই কারখানায় তৈরি নিজেদের সব বেবি ফর্মুলা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয় অ্যাবট। পাশাপাশি বন্ধ রাখা হয় ওই কারখানার সব উৎপাদন। মূলত এর পর থেকেই সংকটের সূত্রপাত। কারণ মিশিগানের ওই কারখানাই যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বেবি ফর্মুলা উৎপাদক। পাশাপাশি অ্যাবটের যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহের অর্ধেকই উৎপাদন হয় ওই কারখানায়।

যুক্তরাষ্ট্রের ডাটা অ্যানালাইসিস প্রতিষ্ঠান ডাটাসেম্বলি জানিয়েছে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা পর্যায়ে বেবি ফর্মুলার ঘাটতি প্রায় ৪৩ শতাংশ। এ অবস্থায় অনেক উদ্বিগ্ন বাবা-মা বেবি ফর্মুলা কিনতে চষে বেড়াচ্ছেন মাইলের পর মাইল। অনেক স্থানে বেবি ফর্মুলা বিক্রি হচ্ছে বর্ধিত দামে। এ ছাড়া অনেক রাজ্যেই স্বল্প আয়ের পরিবারগুলোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের সহায়তা হিসেবে দেয়া বেবি ফর্মুলার একমাত্র সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাবট। এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন এ সহায়তার ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলো।

দেরিতে ঘুম ভেঙেছে বাইডেন প্রশাসনের

এ পরিস্থিতি শুরু হওয়ার প্রথম কয়েক সপ্তাহ তেমন কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি বাইডেন প্রশাসনের। বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হয় খোদ ডেমোক্রেট শিবিরে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম দেখা দেয়ায় বেবি ফর্মুলার উৎপাদন সংক্রান্ত আইন সংশোধনের পাশাপাশি বিদেশ থেকে জরুরি ভিত্তিতে বেবি ফর্মুলা আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে মার্কিন সরকার। ইতোমধ্যেই ইউরোপ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতে শুরু করেছে বেবি ফর্মুলা বহনকারী বিশেষ বিমান।

পাশাপাশি মিশিগানের কারখানায় ফের উৎপাদন শুরুর ব্যাপারে অ্যাবটের সঙ্গে সমঝোতা হয়েছে এফডিএর। তবে উৎপাদন প্রক্রিয়া শুরু হতেও কয়েক সপ্তাহ লেগে যেতে পারে বলে জানিয়েছে এফডিএ।

সহসাই কাটছে না সংকট

এ পরিস্থিতিতে সামনের সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের শিশুখাদ্যের সংকট আরও মারাত্মক রূপ ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ অ্যাবট নিউট্রিশন জানিয়েছে, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে উৎপাদন শুরু করলেও সেই পণ্য ভোক্তাদের হাতে পৌঁছাতে আরও মাস দুয়েক লেগে যেতে পারে। এ অবস্থায় বেবি ফর্মুলার সংকট না কাটা পর্যন্ত, ছয় মাসের বেশি বয়সী শিশু এবং যে সব শিশুর ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট বেবি ফর্মুলার ব্যাপারে চিকিৎসকের নির্দেশনা নেই, এমন শিশুদের গরুর দুধ খাওয়ানোর পরামর্শ দিয়েছে আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকস।

সম্পর্কিত নিউজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button